আমরা কম বেশি সবাই মেথি নামটি শুনেছি। কিন্তু এর সম্বন্ধে আমরা খুব কম জানি। তাই আমরা প্রথমে মেথির ব্যাপারে কিছু আলোচনা করব। মেথি একটি ভেষজ উপাদান। যা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল,পশ্চিম এশিয়ায় এবং দক্ষিণ ইউরোপ এ পাওয়া যায়।
এটি ভারতে রান্নার ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো হয় এবং নানা ঘরোয়া প্রতিকার হিসাবে এটি কে ব্যবহার করা হয়। পোকা তাড়ানোর জন্যও মেথি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মেথিতে বিভিন্ন ধরনের উপাদান থাকে যেমন থিয়ামিন, ফলিক এসিড,নিয়াসিন, রাইবোফ্ল্যাভিন,ভিটামিন এ, বি৬ এবং সি। যা আমাদের শরীরে জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মেথির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে “Fenugreek”। ইহা একটি মৌসুমী জাতীয় গাছ। গ্রামবাংলায় এটির পাতাকে শাক হিসেবেও খাওয়া হয়ে থাকে। এটির বৈজ্ঞানিক নাম হলো “Trigonella foenum-graecum”।
মেথি খাওয়ার উপকারিতা
1। হজম শক্তি বৃদ্ধিতে
সহজ উপায়ে দেহে হজম শক্তি বৃদ্ধি করতে মেথি বীজ দারুণ ভুমিকা পালন করে। মেথিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবার যা বাওয়েল মুভমেন্টে উন্নতি করে হজমে অনেক সহায়তা করে থাকে। তাই কনস্টিপেশনের সমস্যা দূর করতে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে খালি পেটে মেথি ভেজানো পানি খাওয়া যেতে পারে।
2। শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমাতে
মেথিতে স্টেরিওডাল সেপোনিনস নামক উপাদান থাকে যা শরীরে থাকা কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে অনেক সাহায্য করে। এতে থাকা পটাশিয়াম রক্তে লবনের পরিমাণ কমিয়ে আনতে সাহায্য করে যার ফলে ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে থাকে। এছাড়া এতে গ্লেকটোম্যানান নামক আরেকটি উপাদানের খোঁজ পাওয়া গেছে যা হার্টের কর্মক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তাই নিয়মিত মেথি ভেজানো পানি পান করলে হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক এর মাত্রা অনেক আংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
3। রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে
যাদের কম বয়সেই ব্লাড সুগার ঊর্ধমুখি অর্থাৎ রক্তে চিনির পরিমাণ বেশি থাকে তারা নিয়মিত মেথি ভেজানো পানি খেতে পারেন। এটি তাদের শরীরে গ্লেকটোমেনানের পরিমাণ বাড়ানো ছাড়াও দেহে শর্করার শোষণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে সক্ষম। এতে রক্তে সুগার লেভেল বাড়ার আশঙ্কা অনেক কমে যায়। এছাড়া মেথিতে থাকা অ্যামাইনো অ্যাসিড ইনসুলিনের কর্মক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয় ফলে ব্লাড সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় না।
4। চুল পড়া রোধে
প্রাচীনকালে চুল পড়া রোধে মেথির ব্যবহার হয়ে আসছে। স্বাস্থ্যহীন চুলের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত খাওয়া ছাড়াও মেথি বেটে মাথায় দেওয়া যেতে পারে। এজন্য মেথি বাটা নারিকেল তেলের মধ্যে সারা রাত চুবিয়ে রেখে সকালে চুলে মেখে এর ঘণ্টাখানেক পর গোসল করে ফেললে অনেক উপকার পাওয়া সম্ভব।
Also Read: মধুর উপকারিতা ও অপকারিতা
5। ত্বক উজ্জ্বল রাখতে
রূপচর্চায়ও মেথির অনেক সুনাম রয়েছে। চেহারায় বলিরেখা দেয়ার জন্য দায়ী নানা ক্ষতিকর উপাদান দূর করতে মেথির ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ ছাড়া চোখের নিচে কালো দাগ দূর করতেও মেথির ভুমিকা অপরিসিম।
6। খুশকি দূর করতে
অনেকের চুলে প্রচুর খুশকি হয়ে থাকে যা মাথার শুষ্ক ও মৃত ত্বকের কারণে হয়ে দাড়ায়। খুশকির সমস্যা একেবারে দূর করতে মেথি সারারাত পানিতে ভিজিয়ে রেখে বেটে পেস্ট তৈরি করতে হবে তবে চাইলে এর সাথে দই মেশানো যেতে পারে। এই মিশ্রণ মাথার ত্বকে লাগিয়ে ৩০ -৪০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলতে হবে। নিয়মিত এর ব্যবহারে দ্রুত খুশকি অপসারণ হবে।
7। মহিলাদের ঋতুকালীন ও প্রসবজনিত সমস্যার সমাধানে
সাইটো-ইস্ট্রোজেন নামক উপাদান থাকে মেথিতে যা নারীদেহে প্রোলাকটিন নামের হরমোনের মাত্রার বৃদ্ধি্তে অনেক সাহায্য করে। এই হরমোন নারীদেহকে সুগঠিত করতে সাহায্য ছাড়াও ঋতুকালীন বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে খুবই কার্যকরী। এছাড়া বিশেষজ্ঞরা মহিলাদের জরায়ুর সংকোচন ও প্রসারণের যন্ত্রণা কমাতে মেথির অবদান প্রমান করেছেন। তবে ইহা অতিরিক্ত খাওয়া হলে গর্ভপাত বা অপরিণত শিশুর জন্মদানের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। তাই অবশ্যই গর্ভবতী মায়েদের আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে তারপর এটি খেতে হবে।
8। ক্যান্সারকে দূরে রাখতে
আমাদের রক্তে যদি টক্সিক উপাদানের মাত্রা বাড়তে থাকে তাহলে ক্যান্সার সেলের জন্ম নেওয়ার আশঙ্কাও অনেক বেড়ে যায়। আর এই ক্যান্সারকে দূরে রাখতে মেথি বীজের রয়েছে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা। এতে থাকা ক্যান্সার প্রতিরোধী উপাদান রক্তে ভেসে বেরানো টক্সিক উপাদানগুলোকে শরীর থেকে অপসারণ করতে সাহায্য করে। তাই শরীরে ক্যান্সার সেলের জন্ম নেওয়া প্রতিরোধ করতে নিয়মিত মেথির বীজ কিংবা মেথিশাক খাওয়া উচিত।
9। দেহের ওজন কমাতে
নিয়মিত মেথি ভেজানো পানি পান করলে তা শরীরের স্থূলতা কমাতে অনেক সাহায্য করে। কেউ যদি প্রতিদিন সকালে খালি পেটে মেথি বীজ পানিতে ভিজিয়ে খাওয়ার অভ্যাস করে তাহলে তাঁর শরীরে ধীরে ধীরে ফাইবারের মাত্রা আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। এতে একদিকে যেমন তাঁর ক্ষিদে কমে যায় অন্যদিকে অতিরিক্ত খাবার গ্রহনেও লাগাম পরে। এতে শরীরের ওজন আস্তে আস্তে কমতে থাকে।
10। জ্বরের প্রকোপ কমাতে ও সর্দি-কাশি সারাতে
আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় আমাদের শরীলে জ্বর হানা দেয়। এ অবস্থায় কেউ যদি এক গ্লাস মেথি বীজের পানি পান করেন তাহলে অনেক উপকার পেতে পারেন। মেথিতে অনেক উপকারি উপাদান রয়েছে যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে অনেক বৃদ্ধি করে এবং দ্রুত জ্বরের প্রকোপ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া সর্দি-কাশি সারাতেও ঘরোয়া চিকিৎসা হিসাবে এর কোনো বিকল্প নেই বললেই চলে।
Also Read: রসুনের উপকারিতা ও অপকারিতা
মেথির অপকারিতা
মেথি সুস্বাস্থ্যে এবং স্বাদ এর জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। কিন্তু অতিরিক্ত এবং অপব্যবহার করা উচিৎ নয়। কারণ এর ফলে কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যাও সৃষ্টি হতে পারে। সব জিনিসের উপকারিতা ও অপকারিতা আছে। ঠিক তেমনি মেথির উপকারিতা ও অপকারিতা রয়েছে। এখন আমরা মেথির অপকারিতা জানবো।
- বেশি মাত্রায় খেলে , মেথি তার টেরাটোজেনিক সম্ভাবনার কারণে জন্ম দোষ সৃষ্টি করতে পারে।তাই আপনি ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী এর ব্যবহার শুরু করুন।
- মেথি একটি জরায়ুজ উদ্দীপক তাই অতিরিক্ত পরিমাণে মেথি খেলে এটি গর্ভাশয়ে সংকোচনের কারণ হয়ে যেতে পারে যা প্রারম্ভিক প্রসববেদনার উপর অনেক প্রভাব ফেলতে পারে।
- যখন বেশি পরিমাণে মুখের মাধ্যমে মেথি নেওয়া হয় তখন তা পেট ব্যথা, গ্যাস ও ডায়রিয়া হতে পারে।
- মেথি থেকে হওয়া এলার্জি প্রতিক্রিয়ার সাধারণ লক্ষণ হল বাত, ফুসকুড়ি,শ্বাস এবং অজ্ঞানহয়ে যাওয়া ইত্যাদি।
- আপনি যদি কোনো ওষুধ সেবন করেন তাহলে ওষুধগুলি গ্রহন করার অন্তত দুই ঘণ্টা পরে বা আগে মেথির ব্যবহার করা উচিত।
আশা করি আপনারা মেথির উপকারিতা ও অপকারিতা বুঝতে পেরেছেন। যদি আরো কিছু জানার ইচ্ছা থাকে তাহলে আমাদের এই পোস্ট এর নিচে কমেন্ট করুন। আমরা আপনার প্রশ্নের উত্তর দেব।
